মালয়েশিয়া বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে নতুন একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে শ্রমিক নিয়োগে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ড অনুসরণ, মধ্যস্বত্বভোগী নির্মূল এবং নিয়োগকর্তা কর্তৃক অভিবাসন খরচ প্রদানের নীতি চালু করে একটি উত্তম রিক্রুটমেন্ট ও কর্মী ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত করার ঘোষণা মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রণালয় দিয়েছে। ব্লুমবার্গ পত্রিকার তথ্য মতে মালয়েশিয়ার সরকার কর্তৃক ব্যবহারকৃত এফডব্লিউসিএমএস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট এই সিস্টেমটি তৈরি করেছে এবং এর প্রতিষ্ঠাতা আমিনুল ইসলামকে বিদেশি শ্রমখাতের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বলে উল্লেখ করেছে। সরাসরি নিয়োগকর্তা কর্তৃক বিদেশি কর্মী নির্বাচন করার আলোচিত সম্ভাব্য পদ্ধতি সম্পর্কে ইতোমধ্যে মালয়েশিয়ার রিক্রুটিং এজেন্সির সংগঠনগুলি তাদের উদ্বেগ সরকারকে জানিয়েছে। মানব সম্পদ মন্ত্রী রামানন রামাকৃষ্ণান একটি অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন যে, এ ব্যাপারে সরকার এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয় নি।
জানা গেছে, নতুন প্ল্যাটফর্মটির নাম ইউনিভার্সাল রিক্রুটমেন্ট অ্যাডভান্সড প্ল্যাটফর্ম (তুরাপ)। এটি একটি ডিজিটাল পোর্টাল, যেখানে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বিদেশি কর্মী খুঁজে নিতে পারবে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমবে এবং নিয়োগ ব্যয়ও হ্রাস পাবে।
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান রামাকৃষ্ণন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরুতে এক সাক্ষাৎকারে এই নতুন ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেন।
এর আগে, ব্লুমবার্গ নিউজ জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে। সেখানে আমিনুল ইসলাম ও তার প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সেই একই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নতুন সিস্টেম চালু করা নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মালয়েশিয়ার মন্ত্রী ব্লুমবার্গের রিপোর্টকে অসমর্থিত এবং ভুল বলেছেন। তিনি বলেন, প্রতিবেদনে এমন বিবরণ রয়েছে যা মন্ত্রিসভায় কোনও প্রস্তাব পেশ করার জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত মন্ত্রী হিসাবেও তাঁর জানা ছিল না। তিনি কুয়ালালামপুরে বৃহস্পতিবার উইসমা বার্নামার কনকর্ড ক্লাবের সাথে একটি সংলাপ সেশনে এ কথা বলেন। ‘কর্মসংস্থান, মজুরি ও ভবিষ্যৎ’ বিষয়ক সংলাপটি পরিচালনা করেন বারনামার চেয়ারম্যান দাতু শ্রী ওং চুন ওয়াই। সংলাপে অংশ নিয়ে মন্ত্রী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “এটি আমাকে হতবাক করেছে যে তারা প্রস্তাবিত ব্যবস্থা সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশি জানে বলে মনে হচ্ছে। আমি মন্ত্রিসভায় কিছুই পেশ করিনি, তবুও তারা এটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছে।” মিঃ রামানন জোর দিয়ে বলেছেন যে, বেস্টিনেট ২০১১ সাল থেকে মালয়েশিয়া সরকারের সাথে কাজ করছে এবং বিদেশী কর্মী কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাপনা সিস্টেম (FWCMS) প্রদান করে, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ব্যবহার করে। তিনি বলেন, সিস্টেমটি ইতোমধ্যে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে, যার মধ্যে কোভিড-১৯ মহামারীর সময় সাইবার আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে এবং জাতিসংঘের পুরষ্কার সহ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, নতুন তুরাপ সিস্টেম চালুর বিষয়টি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এটি বাস্তবায়নের আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মতি এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন হবে। তার আগে মানব সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্মী নিয়োগের উৎস দেশগুলোর সাথে প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সাথেও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জিরো কষ্ট মডেলে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করেছে এবং উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে মর্মে যৌথ বিবৃতিতে প্রকাশ করেছে। জানা গেছে মালয়েশিয়া সরকার চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে এটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এদিকে নতুন সিস্টেমের ফলে উল্টো নিয়োগকর্তাদের খরচ বেড়ে যাবার আশঙ্কা করেছে মালয়েশিয়ার লাইসেন্সধারী এজেন্টদের সংগঠনগুলো। তাদেরকে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি অংশ আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও করেছে।
বাংলাদেশের মন্ত্রী পর্যায়ের সফরের প্রেক্ষিতে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার কর্মী নিয়োগ শুরু কি আগের মতো সিন্ডিকেট করা হবে না কি সকল রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত করা হবে এ নিয়ে নানান রকমের আলোচনা চলছে। এ নিয়ে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সুনির্দিষ্ট করে কিছুই বলা হয় নি। তবে মালয়েশিয়া সরকারের ১০ টি শর্ত মতে বাংলাদেশ তালিকা মালয়েশিয়া সরকারের নিকট দিয়েছে। সেই তালিকায় থাকা রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কি এবার দায়িত্ব পাবে না কি পাবে না বিষয়টি কোনো পক্ষই পরিষ্কার না করায় বিতর্ক রয়েই গেছে।


