স্বাগতম আমার ট্রাভেল ব্লগে! আমি এম আর জান্নাত স্বপন, আজ আপনাদের নিয়ে যাবো মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যের একটি শহর জোহর বারু। নেগেরি সেম্বিলান রাজ্যের রাজধানী সেরেম্বান। মলাক্কা প্রদেশের একটি শহর পোর্ট ডিকশন। কুয়ালালামপুরের একটি ব্যস্ততম এলাকা বুকিত বিনতাং। কুয়ালালামপুরের একটি আবাসিক এলাকা কোতারয়া। চায়না মার্কেট এবং মালয়েশিয়ার পাহাং রাজ্যের একটি জনপ্রিয় পাহাড়ি রিসোর্ট গেন্টিং হাইল্যান্ডস।
তো বন্ধুরা চলুন, শুরু করি আমাদের যাত্রা!
আজকে আপনাদের সাথে শেয়ার করবো আমার সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। ২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ২ দিন সিঙ্গাপুরে ভ্রমণ শেষে, বাসে করে সিঙ্গাপুরের উডল্যান্ড চেকপোস্ট হয়ে মালেশিয়া যাই। কোন প্রকার বাধা বিপত্তি ছাড়াই ৩০ সেকেন্ডে দ্রুত, সহজ ভাবে ২ দেশেই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করি।
মালয়েশিয়ার ইমেগ্রেশন সম্পন্ন করার পর বাসে করে যাই লারকিন সেন্টাল বাস টার্মিনাল। সেখানে রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়েই প্রথমবার দেখা মেলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে। কেউ কাজ করছেন। কেউ কাজ খুঁজছেন। আবার, অনেকে নতুন এসেছেন। তাদের জীবনের নানা গল্প শুনি। কিনি হট লিঙ্ক এর সিম কার্ড। নিয়ে নেই ৩০ জিবি ইন্টারনেট প্যাকেজ।
জোহর বারুর লারকিন সেন্টাল বাস টার্মিনাল থেকে বাস ধরে। মালেশিয়ার সেরেম্বান শহরে পৌঁছাই। কন্সট্রাকশন সাইটে কাজ করা কিছু প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাথে দেখা করি। তাদের জীবন ও সংগ্রামের গল্প শুনি। তাদের স্বপ্ন, আশা, দুঃখ, কষ্ট ও মনের বেদনা ভালো ভাবে বোঝার জন্য তাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করি। সেখানে তাদের সাথে ২ রাত কন্সট্রাকশন সাইটে থাকি।
তাদের অনেকেই সেখানে অনেক বছর থেকে থাকেন। অনেকে নিজের ভাগ্যে পরিবর্তন আনতে পারেননি। সেরেম্বানের প্রবাসী বাংলাদেশীদের সাথে কথা বলে জানতে পারি তাঁরা বেশীর ভাগই প্রতারিত হয়েছেন নিজের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা।
কষ্ট করে যে টাকা পাঠিয়েছেন পরিবারের কাছে, গচ্ছিত রাখার জন্য। তার বেশীর ভাগই নষ্ট করেছেন পরিবারের সদস্যরা। তাই মনের দুঃখে এমন অভিজ্ঞতার কারনে অনেকে টাকা পাঠান না দেশে। “পরিবার থেকে বলা হয় বাবা তুই দেশে আসলে আসিস। না আসলে না আসিস। কিন্তু, টাকা পাঠাইস”।
ওইসময় যাদের ইন্টারভিউ করেছি তাঁরা বলছেন পরিবারের কাছে প্রবাসীরা যেন টাকার মেশিন। তাদের ভালো মন্দের খোঁজ কেউ নেয়না। এটাই তাদের মনের প্রধান দু:খ।
মালেশিয়ায় কাজ নেই। বেশীর ভাগ প্রবাসীর বৈধ ওয়ার্ক পারমিট নেই। পাসপোর্ট রিনিউ করেনি অনেকে। অবৈধ হয়ে পালিয়ে, লুকিয়ে কাজ করছেন। কষ্টে দিন পার করছেন তাদের অনেকেই। আবার কেউ কেউ পাসপোর্ট রিনুয়াল করতে গিয়ে বাংলাদেশ হাই কমিশনে সঠিক সেবা না পেয়ে তাদের বিরুদ্ধে বিস্তর করতে দেখেছি।
সেরেম্বান থেকে স্কুটিতে করে পোর্ট ডিকশন সমুদ্র সৈকত ঘুরে দেখেছি। পোর্ট ডিকশন সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। এরপর সেরেম্বান থেকে বিদায় নিয়ে কেএল সেন্টালের ট্রেনে কুয়ালালামপুর আসি।
মনো ট্রেনে উঠে বুকিত বিনতাং এ যাই এবং হোটেলে উঠি। বুকিত বিনতাংয়ের রাস্তায় এখানে সেখানে বাংলাদেশির দেখা মেলে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে। কাজের অভাবে পথে পথে ঘুরছেন অনেকে। কিছু বাংলাদেশিকে ভিক্ষে করতেও দেখেছি।
মালেশিয়ায় বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের অনেক সাফল্যের গল্প রয়েছে। তবে ব্যবসার ক্ষেত্রে সমবায়ের সফলতা খুব বেশি নেই বাংলাদেশি কমিউনিটিতে। এমন কয়েকজনের সাফল্যর গল্পও শুনেছি। কথা হয় তাদের একজন প্রবাসী আমির হোসেনের সাথে। তিনি বলেন আমাদের উদ্দেশ্য শুধু মাত্র ব্যবসা নয়। প্রবাসে নিজ দেশের ব্রান্ডিং করা এবং কম মুল্যে দেশি ভাইদের হাতে মান সম্পন্ন পণ্য হাতে তুলে দেওয়াই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য।
ট্যাক্সি ভাড়া করে যাই টুইন টাওয়ার দেখতে। অনেক অনেক ছবি তুলি।
বুকিত বিনতাং কুয়ালালামপুরের প্রাণকেন্দ্র। যেখানে রাতের জীবন, জীবন্ত হয়ে ওঠে। এখানে কেনাকাটা, খাওয়া-দাওয়া এবং বিনোদনের জন্য অসংখ্য সুযোগ রয়েছে। রাতের বেলা, এই এলাকাটি আলো ঝলমলে হয়ে ওঠে।
বন্ধুরা, এখানে স্ট্রিট ফুডের খাবার খাই। পাকিস্থানী রেস্টুরেন্ট গুলোর খাবারের স্বাদ গ্রহণ করি। রাতের জীবন উপভোগ করি। স্ট্রিট সিঙ্গারদের গান বাজনা শুনি।
পরের দিন, কোতারয়া এলাকায় বেশকিছু বাংলাদেশিদের সাথে পরিচিত হয়েছি। তাদের অনেকেই দোকানদারি করেন। রেস্টুরেন্টে কাজ করেন কিংবা অন্য কোনো কাজে যুক্ত আছেন। তাদের দু:খ-কষ্টের পাশাপাশি স্বপ্ন ও আশাও শুনেছি। তারা আমাকে তাদের দৈনন্দিন জীবন সংগ্রাম এবং স্বপ্নের কথা শোনায়। রাতে কোতারয়া থেকে ফেরার পথে টুরিস্টদের জন্য ফ্রি সরকারী বাসে করে বুকিত বিন্তাং পৌছাই।
কুয়ালালামপুরে আবারো দেখা হয় নোয়াখালী কমিউনিটির লিডার খালেদ সাইফুল্যাহ ভাইয়ের সাথে। তার সাথে বুকিত বিন্তাং ঘুরি। একসাথে গেন্টিং হাইল্যান্ডে গিয়ে ক্যাসিনো দেখেছি। ক্যাবল কারে চড়ে অনেক অনেক মজা করেছি। সুউচ্চ এক পাহাড়ের উপরে গড়ে তোলা আধুনিক এই নগরী গেন্টিং হাইল্যান্ডস ।
কুয়ালালামপুর থেকে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত এই স্থানটি শীতল জলবায়ু এবং বিনোদনের জন্য বিখ্যাত। শপিং, থিম পার্ক, থিয়েটার বা সিনে হল, গান বাজনা, ডিস্কো, বার! কী নেই?
তবে আকর্ষনের মধ্যবিন্দু এসব নয়। প্রধান আকর্ষন এখানকার ক্যাসিনো। গেন্টিং স্কাইওয়ে কেবল কারে করে পাহাড়ের উপরে উঠা যায়। যা একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা। সারা বছরই পর্যটকদের ভিড় থাকে গেন্টিং হাইল্যান্ডস এলাকায়।
মালয়েশিয়া ভ্রমণ করে আমি অনেক কিছু শিখেছি। বিশেষ করে, বাংলাদেশি প্রবাসীদের জীবন ও সংগ্রাম সম্পর্কে জানতে পেরে আমি অনেক অনুপ্রাণিত হয়েছি।
দেশে ফেরার সময় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স আমার ইকোনোমি ক্লাসের এয়ার টিকেট বিজনেস ক্লাসে রূপান্তর করে দেয়। এই ভ্রমণ আমার যাত্রাকে আরও আরামদায়ক করে তুলেছিল। ধন্যবাদ ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স।
বাংলাদেশীরা মালয়েশিয়ার বিদেশী শ্রম শক্তির বৃহৎ অংশ। মালয়েশিয়া ভ্রমণ আমার জীবনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এই ভ্রমণে আমি শুধু মালয়েশিয়ার সৌন্দর্যই দেখিনি বরং সেখানকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিকূলতার সাথে জীবন, সংগ্রামও গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি।
তাদের কষ্ট, দুঃখ, স্বপ্ন এবং আশা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তাদের গল্পগুলো আমাকে শিখিয়েছে যে, জীবন কতটা কঠিন হতে পারে এবং কীভাবে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়।
বুকিত বিনতাংয়ের রাতের জীবন। গেন্টিং হাইল্যান্ডসের মনোরম দৃশ্য এবং পোর্ট ডিকশনের সমুদ্র সৈকত আমাকে মুগ্ধ করেছে।
এই ভ্রমণ আমাকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। আশাকরি আমার এই অভিজ্ঞতা অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে। প্রবাসীদের প্রতি আমাদের আরও সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত এবং তাদের স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করা উচিত।
মালেশিয়ার ভিসা প্রসেসিং আমি নিজে অনলাইনে করেছি। এয়ারটিকেটে সহায়তা করেছে ভালো হলিডেজ। আপনারা যারা কম খরচে ৩ দেশ একসাথে ঘুরতে চান তারা ভালো হলিডেজের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
মালেশিয়া ভ্রমণ করে দেশে ফেরার মাধ্যমে বাজেট ফ্রেন্ডলি এই দেশ ভ্রমন সমাপ্ত হলো। ভালো থাকবেন। দেখা হবে অন্য কোন দেশ ভ্রমণের গল্প নিয়ে। আল্লাহ হাফেজ।


