পৃথিবীর সুদূরতম প্রান্তে অবস্থিত হিমশীতল নির্জন মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণপিয়াসী ও পরিবেশ গবেষকদের পরম আকাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। ভৌগোলিক দূরত্ব, চরম প্রতিকূল আবহাওয়া এবং বিপুল খরচের কারণে দক্ষিণ মেরুর এই অসীম বরফসাম্রাজ্যে যাওয়া অনেক বাংলাদেশি অভিযাত্রীর কাছেই এতদিন অলৌকিক স্বপ্নের মতো মনে হতো।
আমাদের এই অভিযানের পেছনে ছিল একটি বৃহত্তর জাতীয়, পরিবেশগত ও আন্তর্জাতিক উদ্দেশ্য। ২০ দিনের এই দীর্ঘ যৌথ অভিযানে আমার অন্যতম সফরসঙ্গী ছিলেন দেশের স্বনামধন্য কনটেন্ট নির্মাতা সালাহউদ্দীন সুমন, যিনি দীর্ঘদিন ধরে ভ্রমণ, পর্যটন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যিক বিশ্ব অনুসন্ধানে নিরলস কাজ করছেন।ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথম ধাপে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের ট্রানজিট হাব যেমন ইস্তাম্বুল, দোহা, দুবাই কিংবা আদ্দিস আবাবা হয়ে প্রথমে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস এইরেসের এজিজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাতে হয়। সেখান থেকে অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরে স্থানান্তর হয়ে আর্জেন্টিনার সর্বদক্ষিণের তিয়েরা দেল ফুয়েগো দ্বীপপুঞ্জের শহর উশুয়াইয়াতে নামতে হয়, যাকে বলা হয় ফিন দেল মুন্দো বা পৃথিবীর শেষ প্রান্ত। ঢাকা থেকে উশুয়াইয়া পৌঁছাতে আন্তর্জাতিক সংযোগ ও ইমিগ্রেশনের সময়ভেদে ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টা লেগে যায়।
অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশের নিজস্ব কোনো সরকার, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বা সার্বভৌম সীমানা নেই। ১৯৫৯ সালের ঐতিহাসিক অ্যান্টার্কটিক ট্রুটি সিস্টেম অনুযায়ী এটি বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক সংরক্ষণের এলাকা। ফলে অ্যান্টার্কটিকায় ঢোকার জন্য কোনো নিজস্ব ভিসার প্রয়োজন হয় না, তবে যে দেশ থেকে জাহাজ ছাড়বে যেমন আর্জেন্টিনা বা চিলি, সেই দেশের বৈধ ভিসা ও অনুমোদন থাকা বাধ্যতামূলক।বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য বর্তমানে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, ঢাকায় আর্জেন্টিনার নিজস্ব দূতাবাস রয়েছে।
ভিসা আবেদনের প্রক্রিয়া
অ্যান্টার্কটিকা যাত্রায় সঠিক অপারেটর এবং অভিযানের রুট নির্বাচন করা সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি। আন্তর্জাতিক অপারেটরদের মধ্যে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের লিন্ডব্ল্যাড এক্সপেডিশনস তাদের বিলাসবহুল সেবা ও বিজ্ঞানভিত্তিক গাইডেন্সের জন্য বিশ্বখ্যাত। অন্যদিকে ওশানওয়াইড এক্সপেডিশনস বা পোসাইডন খরচের সাথে দক্ষতার চমৎকার সামঞ্জস্য অফার করে।
অ্যান্টার্কটিকা বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভ্রমণ গন্তব্যগুলোর শীর্ষে। এর মূল কারণ চরম বৈরী সাগরে চলাচলের উপযোগী আইস-ক্লাস জাহাজ পরিচালনা, অত্যন্ত অভিজ্ঞ মেরু গাইড নিয়োগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো অঞ্চলে ক্রু ও জ্বালানি বহনের বিপুল পরিচালনা ব্যয়।
সাধারণ শীতের জ্যাকেট অ্যান্টার্কটিকায় অকার্যকর। সেখানে ৩-স্তরের পোশাক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। শরীর শুকনো রাখার জন্য ভেতরে মেরিনো উল থার্মাল, মাঝখানে ফ্লিস বা ডাউন ইনসুলেশন এবং বাইরের স্তরে উইন্ডপ্রুফ ও ওয়াটারপ্রুফ গিয়ার ব্যবহার করতে হয়। জোডিয়াক বোটে চড়ে দ্বীপে নামার সময় সাগরের নোনা পানির ছিটা ও বরফ বাতাস থেকে সুরক্ষায় ওয়াটারপ্রুফ প্যান্ট আবশ্যক।
অ্যান্টার্কটিকায় পর্যটন মৌসুম মূলত দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মকাল অর্থাৎ নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত। নভেম্বর মাসে নির্মল ও অক্ষত বরফ দেখা যায় এবং পেঙ্গুইনদের মিলন ও বাসা বাঁধার মৌসুম শুরু হয়। ডিসেম্বর মাসে ২৪ ঘণ্টা দিনের আলো থাকে এবং ডিম ফুটে ছানার জন্ম নেওয়ার রোমাঞ্চকর দৃশ্য দেখা যায়। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে সহনশীল আবহাওয়া থাকে, পেঙ্গুইন ছানারা অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে এবং ফটোগ্রাফির সেরা দৃশ্যপট তৈরি হয়। মার্চ মাস হলো তিমি দর্শনের পিক-সিজন এবং এ সময় বরফ গলন সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে।
| মাস | আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দৃশ্য | বন্যপ্রাণী ও প্রধান আকর্ষণ |
| নভেম্বর | নির্মল ও অক্ষত বরফ, বিশালাকার বরফের চাঁই | পেঙ্গুইনদের মিলন ও বাসা বাঁধার মৌসুম |
| ডিসেম্বর | ২৪ ঘণ্টা দিনের আলো, বরফ গলতে শুরু করার মনোরম দৃশ্য | ডিম ফুটে পেঙ্গুইন ছানার জন্ম নেওয়ার রোমাঞ্চ |
| জানুয়ারি – ফেব্রুয়ারি | তুলনামূলক অনুকূল ও সহনশীল আবহাওয়া | চঞ্চল পেঙ্গুইন ছানা, ফটোগ্রাফির সেরা সময় |
| মার্চ | সামুদ্রিক বরফ গলন সর্বোচ্চ পর্যায়ে | তিমি দর্শনের (Whale watching) পিক-সিজন |
| খরচের খাত | আনুমানিক ব্যয়ের পরিমাণ (USD) | সম্ভাব্য খরচ (BDT) |
| জাহাজ/শিপিং কেবিন ভাড়া | $৮,০০০ – $১৮,০০০ | ৯,৫০,০০০ – ২১,৫০,০০০ টাকা |
| আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমান টিকিট | $২,৫০০ – $৩,৫০০ | ৩,০০,০০০ – ৪,২০,০০০ টাকা |
| আর্জেন্টিনা ভিসা ও ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স | $৩০০ – $৫০০ | ৩৫,০০০ – ৬০,০০০ টাকা |
| বিশেষায়িত মেরু গিয়ার ও গিয়ার রেন্টাল | $৫০০ – $১,০০০ | ৬০,০০০ – ১,২০,০০০ টাকা |
| উশুয়াইয়া ও ট্রানজিটে হোটেল/খাবার | $৮০০ – $১,৫০০ | ১,০০,০০০ – ১,৮০,০০০ টাকা |
| মোট আনুমানিক বাজেট | $১২,১০০ – $২৪,৫০০ | ১৫ থেকে ২৫+ লাখ টাকা |


