
উত্তর-পূর্ব ভারতের দুই পাহাড়ি রাজ্য নাগাল্যান্ড এবং মণিপুর সীমান্তের সুউচ্চ পাহাড়ি সারিতে বিস্তৃত হয়ে আছে রহস্যময়ী জুকো ভ্যালি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮০০০ ফুট উচ্চতায় মেঘাবৃত এই উপত্যকা ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে তার রূপে মুগ্ধ করে পর্যটকদের। তবে জুন-জুলাই মাসে জুকো লিলি আর রডোডেনড্রন ফুলের পসরা নিয়ে উপত্যকাটি যে মোহনীয় রূপে সেজে ওঠে, তা এককথায় স্বর্গীয়। এই ‘জুকো লিলি’ শুধুমাত্র এই উপত্যকাতেই পাওয়া যায়।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, ‘জুকো’ শব্দটি এসেছে আংগামীদের ভিশেমা উপভাষা থেকে, যার অর্থ ‘প্রাণহীন ও নীরস’। ভিশেমাদের পূর্বপুরুষেরা এখানে বসতি গড়তে এসে শীতল আবহাওয়া ও চাষাবাদের অনুপযোগী পরিবেশ দেখে উপত্যকাটিকে সুন্দর হলেও ‘নীরস’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
যদিও অনেকে মনে করেন, উপত্যকার মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া জুকো ও জাফকু ঝিরি (স্থানীয়দের কাছে নদী) থেকে ‘ঠান্ডা জল’ অর্থে এর নামকরণ হয়েছে।
ভ্রমণপথ ও অভিজ্ঞতা
জুকো ভ্যালিতে যাওয়ার জন্য প্রধানত নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমা হয়ে জাকামা বা ভিশেমা থেকে ট্রেকিং শুরু করতে হয়। ভিশেমা পথটি অপেক্ষাকৃত সহজ হলেও সময়সাপেক্ষ। অন্যদিকে, জাকামা রুটটি খাড়া পাহাড়ে ওঠার কারণে কষ্টকর হলেও কম সময়ে চূড়ায় পৌঁছানো যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যেই পথেই যাওয়া হোক না কেন—বিশাল উচ্চতার শতবর্ষী গাছ, ঘন জঙ্গল, পাখির কলকাকলি আর নিস্তব্ধতার মধ্যে দিয়ে ট্রেকিং করার অভিজ্ঞতা সত্যিই শিহরণ জাগানোর মতো। ব্যক্তিভেদে ৩ থেকে ৬ ঘণ্টা ট্রেকিংয়ের পরই এই স্বর্গরাজ্যের দেখা মেলে।
উপত্যকার চূড়ায় রাত্রিযাপনের জন্য তাবু ও গেস্টহাউজের ব্যবস্থা রয়েছে। ভোরে পাহাড়ের উপর বসে তুলোর মতো বিস্তৃত ভ্যালির দিগন্তে যখন সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখি, তখন মন প্রশ্ন করে—প্রকৃতি এতটাও সুন্দর হতে পারে?
সৌন্দর্যের মালিকানা ও পরিবেশগত সংকট
জুকো ভ্যালির মালিকানা নিয়ে নাগাল্যান্ড ও মণিপুরের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলমান থাকলেও, এর স্বর্গীয় সৌন্দর্য নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটকের আনাগোনায় ট্রেকিং রুটে প্লাস্টিকের বোতল ও প্যাকেটের স্তূপ তৈরি হচ্ছে। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতে আমাদের আরও অনেক বেশি সচেতন হওয়া জরুরি। ভবিষ্যতে যারা জুকোর অভিজ্ঞতা নিতে যাবেন, তাদের প্রতি অনুরোধ, প্রকৃতির এই বিস্ময়কে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই।


