
পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর এবং একইসাথে বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনা হলো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত। বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অফ ফায়ার’-এ, সক্রিয় আগ্নেয়গিরিগুলো প্রতিনিয়ত ভূতাত্ত্বিক চাপ ও শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে প্রশ্ন জাগে, কেন হয় এই বিস্ফোরণ, এবং ঠিক কখন পৃথিবীর অভ্যন্তর থেকে magma প্রচণ্ড বেগে বেরিয়ে আসে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগ ও টেকটনিক প্লেটের জটিল প্রক্রিয়া বুঝতে হবে।
অগ্ন্যুৎপাতের মূল কারণ: ম্যাগমা ও গ্যাসের চাপ
আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মূল কারণটি নিহিত আছে পৃথিবীর অভ্যন্তরের প্রচণ্ড উত্তাপ এবং চাপের মধ্যে। পৃথিবীর ভূত্বক (Crust) এর নিচে রয়েছে গুরুমণ্ডল (Mantle), যা আংশিক গলিত শিলা দ্বারা গঠিত।
১. ম্যাগমা গঠন (Magma Formation): ভূত্বকের নিচে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে শিলা গলে তৈরি হয় ম্যাগমা। ম্যাগমা চেম্বার বা একটি বড় জলাধারে এই উত্তপ্ত, গলিত শিলা জমা হতে থাকে।
২. গ্যাসের ভূমিকা: ম্যাগমার মধ্যে বিপুল পরিমাণ গ্যাস, প্রধানত জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) এবং সালফার ডাই অক্সাইড (SO2) দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। এটি অনেকটা বোতলজাত সোডার মতো—চাপের কারণে গ্যাস তরলে দ্রবীভূত থাকে।
৩. চাপ বৃদ্ধি: যখন ম্যাগমা ভূত্বকের দুর্বল স্থান বা ফাটল দিয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করে, তখন পারিপার্শ্বিক চাপ কমতে থাকে। চাপ কমে যাওয়ায় দ্রবীভূত গ্যাসগুলো বুদবুদ আকারে ম্যাগমা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। গ্যাস যত বেশি বিচ্ছিন্ন হয়, ম্যাগমা চেম্বারের অভ্যন্তরে তত বেশি চাপ সৃষ্টি হয়।
৪. বিস্ফোরণ: একসময় এই গ্যাসের চাপ ভূত্বক ধরে রাখার মতো সমস্ত শক্তিকে অতিক্রম করে যায়। ফলস্বরূপ, ম্যাগমা একটি অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে প্রচণ্ড গতিতে ভূত্বক ভেদ করে লাভা, ছাই ও গ্যাস আকারে বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়। এটাই হলো অগ্ন্যুৎপাতের ‘কেন’ অংশের সহজ ব্যাখ্যা—অভ্যন্তরীণ গ্যাসের চাপ যখন ভূত্বকের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়।
কখন ঘটে এই অগ্ন্যুৎপাত?
অগ্ন্যুৎপাত কখন ঘটবে, তা মূলত টেকটনিক প্লেটের গতিবিধি ও ম্যাগমা চেম্বারের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার উপর নির্ভর করে:
১. টেকটনিক প্লেটের সীমানা: পৃথিবীর অধিকাংশ আগ্নেয়গিরিই প্লেটের সীমানায় অবস্থিত। যখন একটি প্লেট অন্যটির নিচে (Subduction Zone) চলে যায়, তখন ঘর্ষণ এবং চাপের কারণে শিলা গলে ম্যাগমা তৈরি হয়। ম্যাগমা উপরে উঠে দুর্বল স্থান দিয়ে বেরিয়ে আসে। একইভাবে, দুটি প্লেট যখন একে অপরের থেকে দূরে সরে যায় (Divergent Boundary), তখন সেই ফাটল দিয়ে ম্যাগমা বেরিয়ে আসে।
২. নতুন ম্যাগমার আগমন: যখন কোনো সক্রিয় আগ্নেয়গিরির চেম্বারে ভূ-অভ্যন্তর থেকে নতুন ও উত্তপ্ত ম্যাগমা প্রবেশ করে, তখন চেম্বারের তাপমাত্রা ও চাপ হঠাৎ করে বেড়ে যায়। এটি আগ্নেয়গিরিকে দ্রুত সক্রিয় করে তুলতে পারে।
৩. সিসমিক কার্যকলাপ: বড় ধরনের ভূমিকম্প (Seismic Activity) বা ভূ-কম্পন আগ্নেয়গিরির অভ্যন্তরীণ কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে বা ম্যাগমার পথ খুলে দিতে পারে, যা বিস্ফোরণকে ত্বরান্বিত করে।
৪. ভূ-পৃষ্ঠের বিকৃতি: আবহাওয়ার চরম পরিবর্তন বা হিমবাহ গলে যাওয়ার মতো ঘটনা ভূ-পৃষ্ঠের উপর থেকে চাপ সরিয়ে নিতে পারে। এর ফলে ভূ-অভ্যন্তরে চাপ ভারসাম্যহীন হয়ে ম্যাগমা দ্রুত উপরে উঠে আসতে পারে।
বিপদ ও সতর্কতার লক্ষণ
আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত হওয়ার আগে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে অগ্ন্যুৎপাতের সময়কাল সম্পর্কে পূর্বাভাস দেন। আগ্নেয়গিরি সক্রিয় হওয়ার পূর্বে যে লক্ষণগুলো দেখা যায়, সেগুলোর মধ্যে প্রধান হলো:
-
ভূমিকম্প বৃদ্ধি: আগ্নেয়গিরির নিচের দিকে ম্যাগমার চলাচলের কারণে ঘন ঘন মৃদু ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়।
-
ভূ-পৃষ্ঠের স্ফীতি: ম্যাগমা চেম্বারে ম্যাগমা জমা হলে ভূপৃষ্ঠ ফুলে ওঠে বা উঁচু হয়ে যায়।
-
গ্যাস নিঃসরণ: সালফার ডাই অক্সাইড (SO2) ও অন্যান্য গ্যাসের নিঃসরণ হঠাৎ বেড়ে যায়।
-
তাপমাত্রা বৃদ্ধি: আগ্নেয়গিরির আশেপাশে উষ্ণ প্রস্রবণ ও জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে কোনো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি না থাকলেও, আমরা তিনটি সক্রিয় টেকটনিক প্লেটের (ইউরেশীয়, ভারতীয় ও বার্মা প্লেট) সীমানার কাছাকাছি অবস্থান করি। যদিও আমরা সরাসরি অগ্ন্যুৎপাতের ঝুঁকিতে নেই, কিন্তু পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বড় ধরনের ভূতাত্ত্বিক কার্যকলাপ (যেমন শক্তিশালী ভূমিকম্প) আমাদের অঞ্চলকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে গবেষণার মানোন্নয়ন করা অপরিহার্য।


