
গত শুক্র ও শনিবার প্রায় ৩১ ঘণ্টার ব্যবধানে ঢাকা ও এর আশপাশে চারটি ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর রাজধানী ঢাকার জন্য বড় বিপদের ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের নৈকট্য, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং প্রাণহানির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা এই মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলোকে বড় ভূমিকম্পের একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। গত শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে নরসিংদীর মাধবদীতে রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার উৎপত্তিস্থলের গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার। ভূপৃষ্ঠ থেকে গভীরতা কম হওয়ায় এই কম্পনের তীব্রতা ছিল স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, যা ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অনুভূত হয় এবং শিশুসহ ১০ জন নিহত ও ৬ শতাধিক মানুষ আহত হন।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে দেশে আঘাত হানা ৩৯টি ভূমিকম্পের মধ্যে ১১টির (২৮ শতাংশের বেশি) উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ৮৬ কিলোমিটারের মধ্যে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সীমান্তে থাকা তিনটি সক্রিয় টেকটনিক প্লেটের কারণে প্রতিনিয়ত ছোট ছোট ভূমিকম্প হচ্ছে। তিনি নিশ্চিত করেন, “নরসিংদীতে একটি সাব-ফল্ট রয়েছে, যা এখন অনেক বড় এবং ঢাকার কাছ পর্যন্ত চলে এসেছে। এই ভূমিকম্প প্রমাণ করল যে ঢাকা বড় ঝুঁকির মধ্যে।”
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রাকিব হাসান চারটি কারণে ঢাকার বিপদ স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন:
১. উৎপত্তিস্থল থেকে নৈকট্য: ঢাকার কাছাকাছি এই ফল্ট লাইনটি সক্রিয় হচ্ছে। ২. মাটির দুর্বল গঠন: ঢাকার নতুন অংশগুলো নিচু জায়গায় মাটি ভরাট করে গড়ে ওঠায় ভূমিকম্পের তীব্রতা সেখানে আরও বেড়ে যেতে পারে। ৩. নিয়ম না মানা ভবন: ঢাকার বেশিরভাগ ভবন ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও ডিজাইন কোড মেনে তৈরি হয়নি। ৪. অতিরিক্ত জনঘনত্ব: জনঘনত্ব বেশি হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হবে।
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, বারবার হওয়া এই কম্পনগুলো ভূ-অভ্যন্তরের ফাটলে পুঞ্জীভূত শক্তি নির্গমনের প্রক্রিয়া চালু করেছে এবং এটি বড় একটি ভূমিকম্পের পথ খুলে দিয়েছে।
অন্যদিকে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন দুর্যোগ ফোরামের সদস্যসচিব গওহর নঈম ওয়ারা। যদিও সরকার নগরে ৪৮ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে ভূমিকম্প নিয়ে সচেতন করার কাজ শুরু করার কথা জানিয়েছে, কিন্তু দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সচেতনতা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।


